‘আমরা বাঙালী’-র সাংবাদিক সম্মেলনে দেশীয় নেতৃত্বের প্রতি তীব্র ক্ষোভ।

রাজ্য সচিব গৌরাঙ্গ রুদ্র পাল যূন্মের তোপ: কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগ—সকলেরই অসহযোগিতায় নেতাজীর অখন্ড ভারতের স্বপ্ন অধরা। অর্থনীতিতে নেতাজীর পরিকল্পনা গ্রহণ হলে দেশের বর্তমান দুর্দশা হতো না।

আগরতলা, ত্রিপুরা । ২১ অক্টোবর ২০২৫ঃ ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, ২১ অক্টোবর ১৯৪৩ সাল। এই দিনেই পরাধীন ভারতবর্ষের বীর সংগ্ৰামী নেতা, যুগনায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু সিঙ্গাপুরের মাটিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকার। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণে রেখে আজ রাজ্য কার্যালয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে ‘আমরা বাঙালী’ সংগঠন। উক্ত সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সচিব গৌরাঙ্গ রুদ্র পাল যূন্ম, প্রচার সচিব দুলাল ঘোষ এবং কার্যালয় সচিব গীতাঞ্জলি দেবী।

সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্য সচিব গৌরাঙ্গ রুদ্র পাল যূন্ম তাঁর বক্তব্যে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অবিস্মরণীয় অবদানের কথা বিশদভাবে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই আজাদ হিন্দ সরকারই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। নেতাজী দূরদর্শীতার সঙ্গে উপলব্ধি করেছিলেন যে, বৈদেশিক শক্তির সহযোগিতা ব্যতীত ইংরেজদের কবল থেকে ভারতবর্ষকে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। সেই কারণেই জাপানের সহযোগিতা নিয়ে তিনি এই শক্তিশালী অস্থায়ী সরকার গঠন করেন এবং বিদেশে ভারতীয় বন্দীদের এবং বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের সমন্বয়ে গড়ে তোলেন অপরাজেয় আজাদ হিন্দ ফৌজ।

বক্তব্যের মূল অংশজুড়ে ছিল নেতাজীর নেতৃত্বাধীন সরকারের সামরিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতার বিবরণ। গৌরাঙ্গ রুদ্র পাল জানান, এই অস্থায়ী সরকার দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে বসবাসকারী সামরিক ও বেসামরিক লোকদেরকে নিজেদের ফৌজে সামিল করে এক বিশাল সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করেছিল। এই সরকারের নিজস্ব মুদ্রা, বিচার ব্যবস্থা, ডাক টিকিট এবং দণ্ডবিধি পর্যন্ত ছিল। বিশ্বের জার্মানি, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, জাপান, বার্মা, ফিলিপাইনসহ একাধিক দেশ এই আজাদ হিন্দ সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। তিনি আরও বলেন, এই আজাদ হিন্দ বাহিনীই সুভাষচন্দ্র বসুকে শ্রদ্ধাপূর্বক ‘নেতাজী’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

নেতাজীর নেতৃত্বের ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে সচিব মহাশয় উল্লেখ করেন যে, আন্দামানে প্রথম স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন নেতাজী স্বয়ং। যে দ্বীপটিতে এই ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল, সেটির নামকরণ করা হয়েছিল ‘স্বরাজ দ্বীপ’, যা আজও সেই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। অস্থায়ী সরকারের সর্বাধিনায়ক ও রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন স্বয়ং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। আজাদ হিন্দ ফৌজ আন্দামানের কর্তৃত্ব দখলের পর ভারতের মণিপুর ও নাগাল্যান্ড পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল, যা ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

তবে, বক্তব্যের শেষার্ধে রাজ্য সচিব গৌরাঙ্গ রুদ্র পাল যূন্ম নেতাজীর স্বপ্ন অধরা থাকার কারণগুলি উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রসদ স্বল্পতার মতো কারণ থাকলেও, সবচেয়ে বড় বাধা ছিল দেশীয় নেতৃত্বের অসহযোগিতা ও বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, নেতাজীর স্বপ্ন ছিল অখন্ড ভারতবর্ষের স্বাধীনতা, যেখানে প্রতিটি মানুষের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত হবে। নেতাজী উপলব্ধি করেছিলেন যে, কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতারা পূর্ণ স্বাধীনতার চেয়ে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষপাতী ছিলেন।

অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তিনি সেদিনের রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্য এই দেশের মানুষের যে, তখন কমিউনিস্ট পার্টির তরফ থেকে নেতাজীকে ‘তেজোর কুকুর’ ও ‘কুইসলিং’ বলে দেশের মানুষের কাছে অপপ্রচার ও ব্যাঙ্গাত্মক ছবি এঁকে তাঁর আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।” অপরদিকে, কংগ্রেস নেতারা নেহেরুর ক্ষমতায় বসার স্বার্থে দেশের অখন্ড স্বাধীনতার স্বপ্নকে পূরণ করার জন্য সহযোগিতার বদলে পরোক্ষে ব্রিটিশ শক্তিকে সমর্থন করেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগের নেতৃত্ব কেউই সেই সংকটময় সময়ে নেতাজীকে সহযোগিতা করেননি। তাঁর প্রশ্ন—যদি সেই সময়ে প্রতিটি রাজনৈতিক দল একযোগে সহযোগিতা করতো, তাহলে কি দেশভাগ হতো?

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই দেশের স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বেশি আত্মবলিদান দিয়েছিল বাঙালী জাতি, অথচ দেশীয় নেতৃত্বরা বাঙালীর হাত ধরে এই দেশের স্বাধীনতা আসুক, তা মেনে নিতে পারেননি। ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতৃত্বের প্রতিও তিনি হতাশা ব্যক্ত করেন এই বলে যে, নেতাজীর দেশান্তরী হবার পর ক্ষমতা দখলের জন্য তাঁরা নেতাজীর আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে কমিউনিস্টদের সঙ্গে জোট করেছিলেন, এবং নেতাজীর চিন্তাধারা সকল ভারতবাসীর সামনে তুলে ধরার তেমন প্রচেষ্টা তাঁদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়নি।

পরিশেষে গৌরাঙ্গ রুদ্র পাল যূন্ম বলেন, “আজ আমাদের দেশ বিদেশী ঋণের বেড়াজালে আবদ্ধ, দেশে ব্যাপক বেকারত্ব এবং দিশাহীন সমাজ ব্যবস্থা বিরাজমান। যদি স্বাধীন দেশে নেতাজীর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হতো, তাহলে এই দুর্দশা হতো না।” ব্রিটিশ শক্তি আজাদ হিন্দ ফৌজের সামরিক অভিযানে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত দেশীয় নেতৃত্বের সহায়তায় নেতাজীর বংশধরদের শেষ করার উদ্যোগ নিয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে খন্ডিত স্বাধীনতা মেনে নেয়। এর চরম পরিণতিতে জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এগিয়ে থাকা বাঙালী জাতিকে টুকরো টুকরো করে দিয়ে তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর থেকে আজও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলি আইন কানুন প্রয়োগ করে বাঙালীকে ভাসমান জাতিতে পরিণত করার একই প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে—বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

Related Posts

আইনের শাসন কি কেবলই ভাষণে? রাজ্যে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

আইনের শাসন কি কেবলই ভাষণে? রাজ্যে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

Read more

Continue reading
দেশজুড়ে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, ৮ রাজ্যে IMD-এর অ্যালার্ট।

দেশজুড়ে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, ৮ রাজ্যে IMD-এর অ্যালার্ট।

Read more

Continue reading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You Missed

আইনের শাসন কি কেবলই ভাষণে? রাজ্যে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

আইনের শাসন কি কেবলই ভাষণে? রাজ্যে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

দেশজুড়ে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, ৮ রাজ্যে IMD-এর অ্যালার্ট।

দেশজুড়ে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, ৮ রাজ্যে IMD-এর অ্যালার্ট।

Narendra Modi: বাংলা থেকে ভয় পালাবে, হিসাব হবে প্রতিটা পাপের!” তৃণমূলকে কড়া হুঁশিয়ারি মোদির।

Narendra Modi: বাংলা থেকে ভয় পালাবে, হিসাব হবে প্রতিটা পাপের!” তৃণমূলকে কড়া হুঁশিয়ারি মোদির।

AAP: বড়সড় রদবদল! রাজ্যসভার ডেপুটি লিডার পদ থেকে অপসারিত রাঘব চাড্ডা।

AAP: বড়সড় রদবদল! রাজ্যসভার ডেপুটি লিডার পদ থেকে অপসারিত রাঘব চাড্ডা।

প্রতিশ্রুতি নয়, কাজেই প্রমাণ: অসহায় পরিবারের পাশে IPFT প্রার্থী জিতিরাম ত্রিপুরা

প্রতিশ্রুতি নয়, কাজেই প্রমাণ: অসহায় পরিবারের পাশে IPFT প্রার্থী জিতিরাম ত্রিপুরা

বন্য হাতির তাণ্ডবে বৃদ্ধার মৃত্যু, আক্রান্ত সাংবাদিক, পুলিশ।

বন্য হাতির তাণ্ডবে বৃদ্ধার মৃত্যু, আক্রান্ত সাংবাদিক, পুলিশ।