করবুক, ২১শে আগস্ট, ২০২৫: তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে করবুক বিধানসভা কেন্দ্রের আইলমারা বাজারে আজ কংগ্রেস দলের উদ্যোগে আয়োজিত এক জনসভায় দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শ্রীযুক্ত আশিষ কুমার সাহার নেতৃত্বে এই সভায় এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় নাড়া দিয়ে মথা এবং বিজেপি দল ছেড়ে ৪৪টি পরিবারের ১৮৯ জন ভোটার জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন। নবাগতদের হাতে দলের পতাকা তুলে দিয়ে তাঁদেরকে স্বাগত জানান শ্রী সাহা। এই যোগদান পর্বকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস শিবিরে নতুন করে উদ্দীপনার সঞ্চার হয়েছে, যা আগামী দিনের রাজনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
সভার প্রারম্ভ ও নেতৃত্বের উপস্থিতি
আজ সকাল থেকেই আইলমারা বাজার সংলগ্ন সভা প্রাঙ্গণে কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকদের ভিড় জমতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে এই ভিড় জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি তথা বিধায়ক শ্রীযুক্ত আশিষ কুমার সাহা। এছাড়াও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন গোমতী জেলা কংগ্রেসের সভাপতি শ্রী টিটন পাল, প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক শ্রী মিলন কর, সম্পাদক শ্রী কমল দেওয়ান এবং প্রদেশ যুব কংগ্রেসের সভাপতি শ্রী নীলকমল সাহা। নেতৃত্বের আগমনমাত্রই কর্মী-সমর্থকদের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।
বিজেপি-মথার মোহভঙ্গ, কংগ্রেসে আস্থা জ্ঞাপন
এদিনের সভার মূল আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন দল থেকে কংগ্রেসে যোগদান। ৪৪টি পরিবারের মোট ১৮৯ জন ভোটার, যারা এতদিন তিপ্রা মথা এবং ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থক ছিলেন, তাঁরা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে যোগদান করেন। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শ্রী আশিষ কুমার সাহা নবাগতদের হাতে কংগ্রেসের পতাকা তুলে দিয়ে তাঁদের দলে বরণ করে নেন।[1] নতুন সদস্যরা জানান যে, বিজেপি ও মথার প্রতিশ্রুতির উপর বিশ্বাস হারিয়ে এবং কংগ্রেসের আদর্শ ও নীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েই তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের কথায়, “আমরা উন্নয়ন এবং শান্তির আশায় পূর্বের দলগুলিকে সমর্থন করেছিলাম, কিন্তু পরিবর্তে পেয়েছি শুধু বঞ্চনা এবং বিভাজনের রাজনীতি। কংগ্রেসই একমাত্র দল যা ত্রিপুরার সকল অংশের মানুষের কথা ভাবে।”
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির ভাষণ: সরকারের তীব্র সমালোচনা ও ভবিষ্যতের রূপরেখা
সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শ্রীযুক্ত আশিষ কুমার সাহা রাজ্যের বিজেপি-আইপিএফটি জোট সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “এই সরকার ত্রিপুরার মানুষকে দেওয়া একটিও প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি। কর্মসংস্থান, উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা—প্রতিটি ক্ষেত্রে এই সরকার ব্যর্থ। মানুষ আজ পরিবর্তন চাইছে এবং করবুকের এই যোগদান সভা তারই প্রমাণ।”[2]
শ্রী সাহা আরও বলেন, “বিজেপি বিভাজনের রাজনীতি করে ত্রিপুরার সম্প্রীতির পরিবেশকে নষ্ট করতে চাইছে। অন্যদিকে, তিপ্রা মথা দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দিশাহীনতার কারণে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, একমাত্র কংগ্রেসই পারে ত্রিপুরাকে এই সংকট থেকে মুক্ত করতে।” তিনি নবাগত সদস্যদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, “আপনাদের এই যোগদান কংগ্রেসকে আরও শক্তিশালী করবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে ত্রিপুরার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করি।”[3]
জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের বক্তব্য: সংগঠনকে মজবুত করার ডাক
জেলা কংগ্রেস সভাপতি শ্রী টিটন পাল তাঁর ভাষণে করবুক বিধানসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরেন। তিনি রাস্তাঘাট, পানীয় জল এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল দশার জন্য বর্তমান বিধায়ক ও রাজ্য সরকারের উদাসীনতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “কংগ্রেস সবসময় মানুষের পাশে থেকে তাঁদের সমস্যা সমাধানের জন্য লড়াই করে। আগামী দিনেও আমরা করবুকের মানুষের অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর।”
প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক শ্রী মিলন কর বলেন, “কংগ্রেসের নীতি হল সকলকে নিয়ে একসাথে চলা। আমরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ত্রিপুরার সকল মানুষের উন্নয়নে বিশ্বাসী।” তিনি কর্মীদের উদ্দেশ্যে সংগঠনকে আরও মজবুত করার আহ্বান জানান। সম্পাদক শ্রী কমল দেওয়ানও দলীয় সংগঠনকে শক্তিশালী করার উপর জোর দেন এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা করেন।
যুব কংগ্রেসের সভাপতির আহ্বান: তরুণ প্রজন্মের প্রতি বার্তা
প্রদেশ যুব কংগ্রেসের সভাপতি শ্রী নীলকমল সাহা তাঁর ভাষণে রাজ্যের বেকারত্ব সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “বিজেপি সরকার প্রতি বছর ৫০,০০০ চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু আজ ত্রিপুরার যুবসমাজ হতাশ ও কর্মহীন।[4] কংগ্রেস যুবকদের জন্য নতুন দিশা দেখাতে চায়। আমরা চাই ত্রিপুরার তরুণ প্রজন্ম স্বনির্ভর হোক এবং রাজ্যের উন্নয়নে নিজেদের নিয়োজিত করুক।” তিনি যুব সমাজকে কংগ্রেসের পতাকাতলে একত্রিত হয়ে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করার আহ্বান জানান।
করবুক কেন্দ্রের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও এই যোগদানের তাৎপর্য
করবুক বিধানসভা কেন্দ্রটি ত্রিপুরার তফশিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন। বিগত নির্বাচনগুলিতে এখানে রাজনৈতিক পালাবদল দেখা গেছে। ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনটি বিজেপির দখলে গেলেও ২০২৩ সালে তিপ্রা মথা পার্টি এখানে জয়লাভ করে। এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়লেও, আজকের এই যোগদান সভা দলের পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিপ্রা মথার অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং বিজেপির প্রতি একাংশের মানুষের মোহভঙ্গই এই দলবদলের প্রধান কারণ। তিপ্রা মথা ‘গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড’-এর দাবিকে কেন্দ্র করে উপজাতি ভোট একত্রিত করলেও, পরবর্তীতে বিজেপির সাথে জোট গঠন এবং প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা তাদের সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধেও উন্নয়নমূলক কাজের অভাব এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, কংগ্রেস নিজেদেরকে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
নবাগতদের প্রতিক্রিয়া: আশা ও আকাঙ্ক্ষার কথা
কংগ্রেসে যোগদানকারী এক প্রাক্তন বিজেপি কর্মী জানান, “আমরা ভেবেছিলাম বিজেপি সরকার আমাদের এলাকার উন্নয়ন করবে, কিন্তু গত কয়েক বছরে আমরা শুধু মিথ্যা প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। আমাদের গ্রামে এখনও ভালো রাস্তা নেই, পানীয় জলের সংকট তীব্র।” তিপ্রা মথা থেকে আসা এক সদস্য বলেন, “মথা উপজাতিদের অধিকারের কথা বলে ক্ষমতায় এলেও, আদতে তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করছে। সাধারণ মানুষের কথা ভাবার সময় তাদের নেই।”
ভবিষ্যতের পূর্বাভাস
আইলমারা বাজারের এই সভা এবং যোগদান পর্ব ত্রিপুরার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বলে মনে করা হচ্ছে। কংগ্রেস যে ধীরে ধীরে রাজ্যে নিজেদের হারানো জমি ফিরে পেতে শুরু করেছে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ। বিশেষ করে উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে কংগ্রেসের এই উত্থান শাসক দল বিজেপি এবং তিপ্রা মথার জন্য নিঃসন্দেহে একটি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আগামী দিনে কংগ্রেস এই গণসমর্থনকে কতটা সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে, তার উপরেই নির্ভর করছে ত্রিপুরার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। তবে আজকের এই সভা প্রমাণ করে দিল যে, ত্রিপুরার রাজনৈতিক ময়দানে কংগ্রেস এখনও এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং আগামী দিনে তারা আরও বড় ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত।








