নিউজ ডেস্কঃ শেয়ার বাজারে এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে ওলা ইলেকট্রিক। গত দুদিন ধরে ব্যাপক হারে লেনদেনের উপর ভর করে সংস্থাটির শেয়ারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বুধবার ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিংয়ে এই ইলেকট্রিক টু-হুইলার প্রস্তুতকারক সংস্থার স্টক BSE-তে প্রায় ১৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মঙ্গলবারের ৮.৭ শতাংশ বৃদ্ধির ধারাবাহিকতাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই বিপুল উত্থানের কারণ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারী এবং বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
বুধবার সকাল ১০:৪৫ নাগাদ যখন BSE সেনসেক্স ১৪৩ পয়েন্ট বা ০.২১ শতাংশ বেড়েছিল, সেই সময়েই ওলা ইলেকট্রিকের শেয়ার এক লাফে ১৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। শুধু দামই নয়, লেনদেনের পরিমাণেও দেখা গেছে অভূতপূর্ব আগ্রহ। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত, BSE-তে প্রায় ৩৬ মিলিয়ন শেয়ারের হাতবদল হয়েছে, যেখানে গত দুই সপ্তাহের গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল মাত্র ১২.৯ মিলিয়ন শেয়ার।

ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) এবং BSE মিলিয়ে এই সেশনে এখনও পর্যন্ত মোট ৫২০.৩ মিলিয়ন শেয়ারের লেনদেন হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, মঙ্গলবার শেয়ার বাজারে ওলা ইলেকট্রিকের ৫৮০ মিলিয়ন শেয়ারের লেনদেন হয়েছিল, যা গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই বিপুল পরিমাণ লেনদেনই শেয়ারের দাম বাড়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
NSE-র বাল্ক ডিলের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার গ্রেভিটন রিসার্চ ক্যাপিটাল এলএলপি (Graviton Research Capital LLP) ৪৪.১৩ টাকা দরে ৩২.০৪ মিলিয়ন ওলা শেয়ার কিনেছে এবং ৪৪.১৬ টাকা দরে ৩২.০৩ মিলিয়ন শেয়ার বিক্রি করেছে। একইভাবে, এইচআরটিআই প্রাইভেট লিমিটেড (Hrti Private Ltd) ৪৪.২৬ টাকা দরে ৩৫.৬৯ মিলিয়ন শেয়ার কিনেছে এবং ৪৪.১৫ টাকা দরে ২৭.৭২ মিলিয়ন শেয়ার বিক্রি করেছে। এই ধরনের বড় লেনদেন বাজারে শেয়ারটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলেছে।
কোম্পানির ব্যবসায়িক অগ্রগতির খবর:
শেয়ারের দাম বাড়ার পেছনে কোম্পানির কিছু ইতিবাচক ব্যবসায়িক ঘোষণাও রয়েছে। গত ১৬ই আগস্ট ওলা ইলেকট্রিক তার শেয়ারহোল্ডারদের জানিয়েছে যে, সংস্থার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ৪৬৮০ ভারত সেল (Bharat cell) তাদের ‘রোডস্টার এক্স+ ৯.১ kWh’ এবং ‘এস১ প্রো+’ মডেলে ব্যবহার শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে এই মডেলগুলির ডেলিভারি শুরু হবে।
এছাড়াও, ওলা জানিয়েছে যে তারা সফলভাবে ফেরাইট মোটর (Ferrite motor) তৈরি করেছে, যা দুর্লভ খনিজের উপর নির্ভরশীল নয়। এই পদক্ষেপটি সাপ্লাই চেইনের সমস্যা মোকাবিলায় সংস্থাকে সাহায্য করবে। ওলার নতুন জেন ৪ প্ল্যাটফর্মের উপর ভিত্তি করে তৈরি ইন-হাউস মোটরটিতে পিক পাওয়ার ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, ওজন ২৫ শতাংশ কমেছে, শক্তি দক্ষতা ১৫ শতাংশ বেড়েছে এবং খরচ ৪১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কোম্পানির মতে, এই নতুন প্রযুক্তি ২০২৭ অর্থবর্ষের মধ্যে তাদের মার্জিন আরও উন্নত করতে সাহায্য করবে।
বিশ্লেষকদের মতামত: এখন কি ওলা ইলেকট্রিকের শেয়ার কেনা উচিত?
এই মুহূর্তে ওলার শেয়ার নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে দুটি ভিন্ন মত দেখা যাচ্ছে।
এই ব্রোকারেজ সংস্থাটির মতে, ওলা ইলেকট্রিকের শেয়ার ৪৪.৮ টাকা স্তরের উপরে একটি শক্তিশালী ব্রেকআউট দিয়েছে, যা একটি নতুন ঊর্ধ্বমুখী ধারার সূচনা করছে। তাদের নোটে বলা হয়েছে, “স্টকটি শুধুমাত্র তার ২০-দিন এবং ৫০-দিনের সিম্পল মুভিং অ্যাভারেজের (SMA) উপরেই বন্ধ হয়নি, বরং ৩৯.৮০-৪০.৮০ টাকার গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট জোনকেও ধরে রেখেছে।” টেকনিক্যাল চার্টে ‘হায়ার হাই-হায়ার লো’ ফর্মেশন এবং বলিঙ্গার ব্যান্ডের উচ্চ সীমা ভেঙে বেরিয়ে যাওয়াকে তারা একটি নতুন “কেনার সংকেত” হিসেবে দেখছে। তারা বিনিয়োগকারীদের ৪৩-৪৪.৯০ টাকা জোনে শেয়ার কেনার পরামর্শ দিয়েছে, যেখানে স্টপ-লস হবে ৪০ টাকা এবং স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ৪৯.৮০-৫৫ টাকা।
অন্যদিকে, কোটাক ইনস্টিটিউশনাল ইক্যুইটিজ কোম্পানির фундаментаল দিক বিচার করে তাদের ‘বিক্রি’ (Sell) রেটিং বজায় রেখেছে। ২০২৫ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ওলার বিক্রি গত বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ কমে ৮৩০ কোটি টাকা হয়েছে। যদিও আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। এই সময়ে কোম্পানির EBITDA ক্ষতি হয়েছে ২৪০ কোটি টাকা এবং মোট লোকসান হয়েছে ৪৩০ কোটি টাকা।
কোটাক আরও উল্লেখ করেছে যে, সার্ভিসিং সংক্রান্ত সমস্যা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে জুন ২০২৪-এর ৪৬ শতাংশ মার্কেট শেয়ার জুন ২০২৫-এ কমে ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্ত কারণ বিচার করে তারা ২০২৬-২৮ অর্থবর্ষের জন্য তাদের ভলিউম অনুমান ১২-১৬ শতাংশ কমিয়েছে এবং শেয়ারটির অপরিবর্তিত মূল্য লক্ষ্যমাত্রা ৩০ টাকা রেখে ‘বিক্রি’ রেটিং বজায় রেখেছে।
সব মিলিয়ে, ওলা ইলেকট্রিকের শেয়ার বর্তমানে একটি আকর্ষণীয় জায়গায় রয়েছে। একদিকে টেকনিক্যাল ইন্ডিকেটর এবং কোম্পানির নতুন প্রযুক্তি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে কোম্পানির আর্থিক ফলাফল এবং السوقে প্রতিযোগিতা বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের কারণ। তাই এই মুহূর্তে ওলা ইলেকট্রিকের শেয়ারে বিনিয়োগ করার আগে বিনিয়োগকারীদের সব দিক ভালোভাবে বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।








