খোয়াই, ১১ই আগস্ট, ২০২৫: যে মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধরে পৃথিবীর আলো দেখান, নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেন, শত কষ্ট সহ্য করে তিলে তিলে সন্তানকে ‘মানুষের মত মানুষ’ করে তোলেন, সেই মায়ের মৃত্যুর পর তার মুখে শেষবারের মতো আগুন দেওয়ার জন্যও সময় হলো না একমাত্র ছেলের। খোয়াইয়ের লালছড়া বাঘাযতীন ক্লাব এলাকায় আজ এমনই এক হৃদয়বিদারক এবং নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী থাকল এলাকাবাসী, যা সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। শহরের প্রতিষ্ঠিত ঔষধ ব্যবসায়ী হয়েও জন্মদাত্রী মায়ের অন্তিম যাত্রায় শামিল না হওয়ায় পাষণ্ড ছেলের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় উঠেছে এবং তাকে সমাজচ্যুত করার জোরালো দাবি উঠেছে।
প্রত্যেক মা-বাবার স্বপ্ন থাকে তাদের সন্তানকে নিয়ে। তারা নিজেদের জীবনের সমস্ত সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে, শেষ সম্বলটুকুও উজাড় করে দিয়ে ছেলেমেয়েদের বড় করে তোলেন। স্বপ্ন দেখেন ছেলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে কিংবা বড় ব্যবসায়ী হয়ে নাম করবে। খোয়াইয়ের লালছড়ার মৃত জগদীশ সাহার স্ত্রী বকুল রানী সাহাও হয়তো এমনই স্বপ্ন দেখেছিলেন তার একমাত্র ছেলে গণেশ সাহাকে নিয়ে। ছেলের পড়াশোনা, প্রতিষ্ঠা— সবকিছুর জন্য হয়তো তিনি আজীবন কষ্ট স্বীকার করেছেন। কিন্তু সেই ছেলেই আজ মায়ের মৃত্যুর পর তার মুখদর্শন করতে এলো না। আজ সকালে নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বৃদ্ধা বকুল রানী সাহা।
তার মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে এলাকায়। কিন্তু সকলের অপেক্ষা ছিল তার একমাত্র ছেলে গণেশ সাহার জন্য। গণেশ খোয়াই শহরের একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব, গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া মেডিকেল হলের কর্ণধার। বর্তমানে তিনি তার ছেলেমেয়ের পড়াশোনার সুবিধার্থে আগরতলায় অবস্থান করছেন। মায়ের মৃত্যু সংবাদ তার কাছে পৌঁছানোর পর পুরো এলাকাবাসী যখন আশা করেছিল যে, ছেলে ছুটে আসবে মায়ের নিথর দেহের পাশে, তখন ঘটে ঠিক তার উল্টোটা।
এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তাকে ফোন করে মায়ের মৃত্যুর খবর জানানো হলে, তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে তার আসা সম্ভব নয়। এরপর তার দোকানের কর্মীরাও বারবার তাকে ফোন করে অনুরোধ করেন, কিন্তু তার পাষাণ মন গলেনি। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তিনি মায়ের প্রতি তার শেষ কর্তব্যটুকু পালন করতেও অস্বীকার করেন। অবশেষে, কোনো উপায় না দেখে, এক প্রকার বাধ্য হয়েই তার মেয়ে এবং বাঘাযতীন ক্লাবের সদস্যরা ও প্রতিবেশীরা মিলে বকুল রানী সাহার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। যে ছেলের হাত ধরে মায়ের পরপারে পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল, সেই ছেলে দূরে থাকল, আর পরשיםই হয়ে উঠল আপন।
একমাত্র ছেলের এমন অমানবিক আচরণে তীব্র ক্ষোভ এবং ধিক্কার জানিয়েছেন এলাকাবাসী। বাঘাযতীন ক্লাবের সদস্যরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। ক্লাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “যে সন্তান তার জন্মদাত্রী মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নেয় না, সে সমাজের কলঙ্ক। আমরা তার এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই এবং তাকে সমাজচ্যুত করার জন্য সকলের কাছে আহ্বান জানাই।” এই ঘটনাটি আজ খোয়াই শহরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা আধুনিক সমাজে পারিবারিক ও মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের এক নির্লজ্জ উদাহরণ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।








