উদ্ধার কাজ নিয়ে উঠলো গাফিলতির অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোললেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
তেলিয়ামুড়া, ত্রিপুরা । ৮ আগস্ট । রিপোর্ট- মৃণ্ময় রায়ঃ তেলিয়ামুড়া মহকুমার চাকমাঘাট এলাকায় ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় লরি চালক মিহির লাল দেবনাথের মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা খোয়াই জেলা জুড়ে। এই মর্মান্তিক ঘটনার তদন্তে শনিবার তেলিয়ামুড়া সফরে আসেন রাজ্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন রাজ্যের রাজস্ব সচিব ব্রিজেশ পান্ডে, আই.জি (আইন শৃঙ্খলা) মনচাক ইপ্পা এবং ফায়ার সার্ভিস ও দুর্যোগ মোকাবেলা দপ্তরের সচিব এল.টি ডার্লিং।

তদন্তে আসা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি দল ছাড়াও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন খোয়াই জেলার জেলা শাসক রজত পন্থ এবং সদ্য নিযুক্ত তেলিয়ামুড়া মহকুমা শাসক আবেধানন্দ বৈদ্য। পুরো প্রতিনিধি দলটি প্রথমেই ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন এবং এলাকাবাসীর সাথে বিশদে কথা বলেন। বিশেষ করে সেইসব স্থানীয় ব্যক্তি যারা দুর্ঘটনার পরপরই সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, তাদের থেকে ঘটনার আদ্যোপান্ত বিস্তারিত জানতে চান তারা।
তদন্তকারীদের প্রশ্ন ছিল— দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কাজ শুরু হতে এত বিলম্ব কেন হলো? কেন স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির তরফে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হলো না?
পরে, তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে পৃথকভাবে ডেকে পাঠানো হয়েছিল উদ্ধার কাজে নিযুক্ত টি.এস.আর সদস্য, পুলিশ কর্মী, মেডিকেল স্টাফ এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের। তাদের প্রত্যেকের সাথে আলাদা আলাদাভাবে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেন তদন্তকারীরা।

প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে যে, মহকুমা শাসকের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অভিযোগ নেই। জানা যায়, ঘটনার খবর রাত সাড়ে আটটার পর তেলিয়ামুড়া থানার ওসি ফোন করে মহকুমা শাসককে অবহিত করেন। খবর পাওয়ার সাথে সাথে তিনি জেলার সমস্ত ডেপুটি কালেক্টরদের ঘটনাস্থলে পাঠান। সেই নির্দেশ পেয়ে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান সুরজিৎ দেববর্মা এবং হরিপদ সরকার।
তবে এর আগেই ফায়ার সার্ভিস এবং টি.এস.আর-এর দুর্যোগ মোকাবেলা টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। যদিও অভিযোগ উঠেছে, ফায়ার সার্ভিসের ওসি বিনয় চক্রবর্তী দায়িত্বে অবহেলা করেন। ঘটনার সময় তিনি স্টেশনে ছিলেন না, এমনকি স্টেশন ছাড়ার আগে কোনও ছুটির অনুমতিও নেননি। পরে তিনি উদয়পুর থেকে বাইকে চেপে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। এই অবহেলার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তদন্তকারী অফিসারদের সামনে জানান একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী।
এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে, উদ্ধার কাজে নিযুক্ত টি.এস.আর এবং আপদমিত্র ভলান্টিয়ারদের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এক নারী প্রত্যক্ষদর্শী এই অভিযোগ তুলে ধরেন তদন্তকারীদের সামনে। এই বিষয়ে তদন্তকারীরা গভীর পর্যবেক্ষণ চালান এবং সব কিছু খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।

এদিকে চিকিৎসকের মত অনুযায়ী, মিহির লাল দেবনাথ দীর্ঘ সময় ধরে লরির নিচে কোমরের নিচে চাপা পড়ে ছিলেন, ফলে তার রক্তসঞ্চালন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। যখন উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত কষ্টে লরির সামনের অংশ কিছুটা ওপরে তোলে, তখন রক্তচাপ হঠাৎ করে বেড়ে যায় এবং তার নাক-মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। অতিরিক্ত রক্তচাপ এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণেই তার মৃত্যু ঘটে বলে জানান চিকিৎসক।
তদন্তকারী দল জানিয়েছে, এই মুহূর্তে তারা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করেননি এবং তদন্ত এখনো চলমান। তবে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু গাফিলতি ও অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তাঁরা।
তেলিয়ামুড়া তথা সমগ্র খোয়াই জেলা এখন প্রশ্নের মুখোমুখি— এমন করুণ ঘটনার পরেও কি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি সময়মত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে? প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বলি কি হতে হলো একজন সাধারণ লরি চালককে?
তদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট সামনে এলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে। তবে এই দুর্ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— দুর্যোগ মোকাবেলায় সময়মতো পদক্ষেপ এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের প্রতি জনসাধারণের আস্থা অটুট রাখতে হলে এমন ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত অপরিহার্য।








