চিনিবাগানে উত্তাল জাতীয় সড়ক, পানীয়জল ও রাস্তা সংস্কারের দাবিতে ডলুছড়া গ্রামবাসীদের বিক্ষোভে অচল কৈলাসহর-ধর্মনগর বিকল্প পথ।
চিনিবাগান, কৈলাসহর | নিজস্ব প্রতিনিধি: উত্তর ত্রিপুরার ঊনকোটি জেলার কৈলাসহরের অন্তর্গত গৌরনগর ব্লকের ভগবান নগর গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন ডলুছড়া গ্রামে পানীয় জল ও রাস্তা সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাকে কেন্দ্র করে সোমবার দুপুরে প্রবল বিক্ষোভে ফেটে পড়ে স্থানীয় গ্রামবাসীরা। প্রশাসনের নীরবতা এবং পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের কার্যকলাপে হতাশ হয়ে চরম পদক্ষেপ হিসেবে তারা কৈলাসহরের চিনিবাগান এলাকায় কৈলাসহর-ধর্মনগর বিকল্প জাতীয় সড়ক অবরোধ করে দেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলা এই অবরোধের ফলে সড়কের দু’পাশে শতাধিক গাড়ি আটকে পড়ে এবং সাধারণ যাত্রীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে।
ডলুছড়া গ্রামের এই সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এটি বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটি সমস্যার জটিল রূপ মাত্র। এই গ্রামে পানীয় জলের কোনো নির্ভরযোগ্য বা স্থায়ী উৎস নেই। নেই গভীর নলকূপ, নেই কোনো পাইপ লাইনের সরবরাহ। কিছুদিন অন্তর জল সংকট এতটাই চরমে পৌঁছায় যে, পান করতে হয় দূরের ঝরনা বা অস্থায়ী কুয়োর জল।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, তারা একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ, গৌরনগর ব্লকের বিডিও অফিস, এমনকি ঊনকোটি জেলার জেলাশাসক ও কৈলাসহর মহকুমা শাসককেও জানিয়েছেন। কিন্তু, কোনও দপ্তর বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষই স্থায়ী সমাধানের জন্য দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি জলের ট্যাংকার দিয়েও সরবরাহ করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা সীমা দেববর্মা জানান,
“আমরা মায়েরা প্রতিদিন সকালে তিন কিলোমিটার হেঁটে বস্তা ও কলসি নিয়ে জল আনতে যাই। শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না। কেউ আমাদের কথা শুনছে না। সরকার শুধু ভোটের সময় আসে।”
পানীয় জলের পাশাপাশি আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো ডলুছড়া গ্রামের প্রধান সড়কটির দুরবস্থা। রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এটি একপ্রকার চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বর্ষার সময় পথচলতি মানুষের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়ে। স্কুলপড়ুয়া শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও কাদায় হাঁটতে বাধ্য হন।
গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেছেন, যদিও স্থানীয় পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ রাস্তা সংস্কারের জন্য বরাদ্দ পেয়েছেন, কিন্তু পঞ্চায়েত সদস্য কোনো কাজ না করেই টাকা তসরুপ করে ফেলেছেন। ফলে শুধু যে সমস্যার সমাধান হয়নি, তা-ই নয়, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর ক্ষোভ এবং প্রশাসনের ওপর আস্থাহীনতা।
? জাতীয় সড়ক অবরোধ: বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠে গ্রামবাসী
সোমবার দুপুরে সেই ক্ষোভই উগরে দেন গ্রামের মানুষজন। প্রাথমিকভাবে গ্রামের প্রৌঢ় ও গৃহিণীরা জড়ো হন চিনিবাগান এলাকায়, যেখানে দিয়ে কৈলাসহর-ধর্মনগর বিকল্প জাতীয় সড়কটি গিয়েছে। সময় গড়াতেই সংখ্যা বাড়তে থাকে। কয়েকশো নারী-পুরুষ সড়কের উপর বসে পড়েন। তাঁদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, ‘জল চাই, রাস্তা চাই’, ‘পানি না থাকলে ভোট নয়’, ‘ভোটে এসে রাস্তা চাইবেন না’ ইত্যাদি স্লোগান লেখা কাগজ।
দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ পুরো পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলত, কৈলাসহরের দিক থেকে আসা ও ধর্মনগরের দিকে যাওয়ার বহু ট্রাক, প্রাইভেট গাড়ি, মোটরবাইক এবং যাত্রীবাহী বাস আটকে পড়ে। অসংখ্য অফিসযাত্রী, পরীক্ষার্থী এবং রোগী বিপাকে পড়েন।
অবরোধ শুরু হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই কৈলাসহর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী ও টিএসআর ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামবাসীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করার চেষ্টা হয়। পুলিশের তরফে অনুরোধ জানানো হয় যেন তারা অবরোধ তুলে নেয়।
কিন্তু, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা সেই অনুরোধ মানতে রাজি হননি। বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এবার তারা আশ্বাসে নয়, বাস্তব পদক্ষেপে বিশ্বাস করবেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অবশেষে বিকল্প উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। দুপুর দেড়টা নাগাদ অবরোধস্থলে এসে পৌঁছান কৈলাসহর মহকুমা শাসক কার্যালয়ের ডেপুটি মেজিস্ট্রেট মতি রঞ্জন দেববর্মা, পানীয় জল ও স্বাস্থ্য বিধান দপ্তরের আধিকারিক নির্মল চন্দ্র বিশ্বাস, গৌরনগর ব্লকের উচ্চপদস্থ আধিকারিক এবং ভগবান নগর গ্রাম পঞ্চায়েতের সচিব ও প্রতিনিধিরা।
প্রায় ৩০ মিনিট ধরে চলে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা—প্রশাসন, দপ্তর এবং গ্রামবাসীদের প্রতিনিধিদের মধ্যে। এরপর প্রশাসনের তরফে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তা মৌখিক ও লিখিতভাবে বিক্ষোভকারীদের জানানো হয়।
? সিদ্ধান্তসমূহ:
- ডলুছড়া গ্রামে যতদিন না স্থায়ী পানীয় জলের সমাধান হচ্ছে, ততদিন প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে দুটি নির্দিষ্ট সময়ে গাড়ির মাধ্যমে জল সরবরাহ করা হবে।
- রাস্তা সংস্কারের কাজ আগামী ৭ দিনের মধ্যেই শুরু করা হবে এবং কাজের তদারকি করবে একটি নিরপেক্ষ কমিটি।
- পঞ্চায়েত সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থ তসরুপের অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের তরফে।
এই প্রতিশ্রুতি ও দপ্তরীয় উপস্থিতি দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হন গ্রামবাসীরা। দুপুর প্রায় ২টা নাগাদ তাঁরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
যদিও বিক্ষোভ ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, কিন্তু জাতীয় সড়ক অবরোধের ফলে ব্যাপক অসুবিধার মধ্যে পড়েন সাধারণ মানুষ। একাধিক যাত্রী বাসে আটক হয়ে পড়েন। কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি অনেকেই। এক কলেজ ছাত্রী জানান,
“আমার সেমেস্টার পরীক্ষা ছিল, কিন্তু গাড়ি আটকে পড়ায় সময়মতো পৌঁছাতে পারিনি। আশা করি প্রশাসন দ্রুত সমস্যার সমাধান করবে।”
একজন ট্রাকচালক বলেন,
“আমরা পথে আটকে থাকলে ক্ষতি আমাদেরই হয়, কিন্তু গ্রামবাসীরা ঠিক বলছে। জলের জন্য এই কষ্ট করা খুবই দুঃখজনক।”
ডলুছড়া গ্রামের ঘটনা শুধু একটি isolated issue নয়, বরং এটি ত্রিপুরার বহু প্রত্যন্ত এলাকার বাস্তবতার প্রতিফলন। যেখানে বারবার দরজা ধাক্কিয়েও যখন কোনো সমাধান আসে না, তখন সাধারণ মানুষ বাধ্য হয় এই ধরনের প্রতিবাদে নামতে।
এই প্রতিবাদ প্রশাসন ও দপ্তরগুলোর চোখ খুলে দেবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে, গ্রামবাসীদের দীর্ঘ অপেক্ষার পর তারা কমপক্ষে কিছু প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিতে পেরেছেন, সেটাই এখন তাদের লড়াইয়ের এক প্রাথমিক জয়।








