ছাত্রাবাস নির্মাণকাজে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগে উত্তাল উত্তর মহারানিপুর — প্রশাসনের নীরবতায় ক্ষোভে ফেটে পড়ল জনতা, অবরোধে স্তব্ধ হয়ে পড়ল প্রধান সড়ক!
খোয়াই, ত্রিপুরা ৩০ জুন ২০২৫ঃ উত্তর মহারানিপুরে সরকারি ছাত্রাবাস নির্মাণে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ঘিরে গোটা এলাকা এখন উত্তাল। রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অধীনে চলছিল আদিবাসী ছাত্রীদের জন্য ‘এসটি গার্লস হোস্টেল’ নির্মাণ। অথচ সেই মানবিক উদ্যোগেই নেমে আসে চরম অমানবিক হামলা ও বাধা।
খোয়াই জেলার কল্যাণপুর থানার অন্তর্গত বলারাম কোবরা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় চত্বরে যখন ছাত্রাবাসের নির্মাণকাজ এগোচ্ছে, তখনই ঘটে এই ভয়াবহ ঘটনা।

২১ জুন, সময় দুপুর ২টা নির্বাচিত ঠিকাদার বিক্রম দেববর্মা তাঁর শ্রমিক দল নিয়ে নিয়মিত কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ঘটনাস্থলে হাজির হন দুই ব্যক্তি— সীতেশ দেববর্মা ও প্রণজিত দেববর্মা ওরফে প্রনয়। অভিযোগ, তারা রড ও ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে শ্রমিকদের ভয় দেখায়, কাজ বন্ধ করার হুমকি দেয় এবং দাবি করে মোটা অঙ্কের চাঁদা।
শ্রমিকরা বাধা দিলে চলে মারধর। বেশ কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর আহত হন। আতঙ্কে কাজ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন বাকিরা।
এখানেই থেমে থাকেনি ঘটনা। স্থানীয়দের দাবি, এই হামলার পেছনে রাজনৈতিক মদত স্পষ্ট। অভিযুক্ত প্রণজিত দেববর্মা হচ্ছেন শাসকদল বিজেপির খোয়াই জেলা জনজাতি মোর্চার সহ-সভাপতি। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণেই প্রশাসন নীরব ভূমিকা নিচ্ছে বলেও অভিযোগ।
ঘটনার পরপরই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগে আক্রমণকারীদের নাম-পরিচয়সহ বিস্তারিত উল্লেখ করা হলেও, ঘটনার নয় দিন পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের তরফে কোনও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
এই প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধেই সোমবার সকাল থেকেই উত্তরের মহারানিপুরে প্রধান সড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। নারী, পুরুষ, তরুণ-তরুণী সকলেই এই বিক্ষোভে সামিল হন। প্ল্যাকার্ড হাতে, কণ্ঠে স্লোগান— “চাঁদাবাজির বিচার চাই”, “দোষীদের গ্রেফতার করো”, “ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করো!”
তাঁদের দাবি ছিল—
✅ হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার
✅ ছাত্রাবাস নির্মাণকাজ পুনরায় চালু
✅ নির্মাণস্থলে স্থায়ী পুলিশি প্রহরা
✅ আদিবাসী ছাত্রীদের জন্য অবিলম্বে হোস্টেল চালু করা
ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন তেলিয়ামুড়া মহকুমার অতিরিক্ত মহকুমা শাসক পান্নালাল সেন এবং মহকুমা পুলিশ আধিকারিক। সঙ্গে ছিল বিপুল পুলিশ বাহিনী। দীর্ঘ আলোচনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দিলে জনতা সাময়িকভাবে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়।
তবে স্থানীয়দের হুঁশিয়ারি স্পষ্ট—
“যদি দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না হয়, তাহলে আগামী দিনে বৃহত্তর ও দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের পথে আমরা বাধ্য হব।”
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, নির্মাণাধীন হোস্টেলে ইতিমধ্যেই কিছু ছাত্রী ভর্তি হলেও, হামলার ঘটনায় কাজ বন্ধ হয়ে থাকায় হোস্টেল চালু করা যাচ্ছে না। নিরাপত্তার অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার অধিকার, বিশেষ করে আদিবাসী কন্যা শিক্ষার্থীরা।
অভিযোগপত্রের অনুলিপি ইতিমধ্যেই পাঠানো হয়েছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, উপজাতি কল্যাণ মন্ত্রী, টিটিএএডিসি’র মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে।
এখন গোটা উত্তর মহারানিপুরবাসীর মনে জেগেছে একটাই প্রশ্ন—
“আইন কি রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে মাথা নত করবে?”
“নাকি প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রশাসন প্রমাণ করবে যে আইন সবার জন্য সমান?”
এই প্রশ্নের উত্তরই এখন চায় গোটা ত্রিপুরা, চায় গোটা সমাজ।








