প্রেমের সম্পর্ক থেকে সামাজিক বিবাহ, শেষমেশ ধর্ষণের মামলা! তেলিয়ামুড়ায় আইনি ঘূর্ণাবর্তে যুবক।
তেলিয়ামুড়া, জুন ১৮: প্রেম—দুই অক্ষরের একটি শব্দ হলেও এর ব্যঞ্জনা বহুমাত্রিক, আবেগঘন এবং জটিল। একদিকে এই শব্দ ভালোবাসা, সম্মিলন, আত্মত্যাগের রূপ, অপরদিকে বাস্তবতার নিরিখে অনেক সময় হয়ে ওঠে বিভ্রান্তি, ভয়, এমনকি অপরাধের ক্ষেত্র। আজকের সমাজে এমন এক ‘অপরিণত প্রেম’-এর গল্প যেন বাস্তবকে ছাড়িয়ে এক নীরব ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে, যার সর্বশেষ অধ্যায় রচিত হলো ধর্ষণের অভিযোগে এক তরুণের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে। ঘটনাটি ঘটেছে ত্রিপুরার তেলিয়ামুড়া থানার অন্তর্গত দশমিঘাট ও কৃষ্ণপুর এলাকায়। প্রায় দশ মাস আগে, দশমিঘাটের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ এবং কৃষ্ণপুর এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক নাবালিকার মধ্যে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। বিষয়টি দুই পরিবারের সম্মতিতেই গড়ায় বিবাহে। মেয়েটির বাড়িতে ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে হিন্দু রীতিনীতি মেনে চার হাত এক করা হয়। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সমাজের কথিত নেতা, সমাজ সংস্কারক, রাজনৈতিক নেতাসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। প্রেম তখন ছিল সামাজিকভাবে অনুমোদিত—একটি সম্পর্ক, একটি গৃহস্থালির সূচনা। বিয়ের পর নববধূ হিসেবে সেই নাবালিকা মেয়েটি স্বামীর বাড়িতে সংসার শুরু করে। কিন্তু সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিছুদিন না যেতেই সম্পর্কের ছন্দপতন শুরু হয়, এবং উঠতে থাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে, দেড় মাস আগে মেয়েটি ফিরে যায় তার পিত্রালয়ে। সূত্র বলছে, উভয় পরিবারের উদ্যোগে একটি সালিশি সভার আয়োজনের কথাও ভাবা হয়েছিল। তবে, যখন স্থানীয় মাতব্বরেরা জানতে পারেন যে মেয়েটি নাবালিকা, তখন আইনি জটিলতার ভয়ে তারা সালিশি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন। এরপর ঘটনাপ্রবাহে নাটকীয় মোড়। যে পরিবার একসময় ঘটা করে বিয়ে দিয়েছিল, আজ সেই পরিবারই আইনকে অস্ত্র করে মেয়েটির ১৯ বছর বয়সী স্বামীর বিরুদ্ধে দায়ের করেছে ধর্ষণের অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, নাবালিকার সঙ্গে বিয়ে করে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া, তা যতটা স্বেচ্ছায় বা সম্মতিতে হোক না কেন—ভারতীয় আইনে তা অপরাধ হিসেবেই গণ্য হয়। ফলে, কোনো দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই তেলিয়ামুড়া থানার পুলিশ অভিযুক্ত যুবককে গ্রেফতার করে। আইনের চোখে এটি ‘স্ট্যাচুটরি রেপ’—নাবালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সম্পর্ক বা সামাজিক অনুমোদন নির্বিশেষে। তবে এখানেই থেমে নেই বিতর্ক। উঠছে একের পর এক প্রশ্ন—
▪︎ নাবালিকার বিয়ে যখন সামাজিকভাবে, সকলের সামনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি কেউ কেন তোলেনি?
▪︎ যাঁরা বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন—পুরোহিত থেকে সমাজপতি, তাঁরা কি দায়মুক্ত?
▪︎ একজন মেয়ের মা যিনি কিছুদিন আগেই জামাইকে গৃহে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তিনি কীভাবে আজ তাঁকে ধর্ষক বলে সমাজে তুলে ধরেন?
▪︎ এবং, আইনের আশ্রয়ে কি সম্পর্কের আসল সত্য চাপা পড়ে যাচ্ছে?
স্থানীয়দের কেউ বলছেন, “এই ঘটনায় আইনের ব্যবহার যতটা সত্য, ততটাই এই সমাজের দ্বিচারিতা ও সুবিধাবাদিতার চিত্র স্পষ্ট।” কেউ আবার বলছেন, “আইন আইনের মতো চলবে। সম্পর্ক যতই আবেগঘন হোক, নাবালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক অপরাধই থেকে যাবে।” এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে—সমাজ ও আইনের মধ্যে রয়েছে এক অদৃশ্য ফাঁক, যা আজো পূরণ হয়নি। সমাজ ভালোবাসা মেনে নিলেও আইন তা নাও মানতে পারে। আবার পরিবার যতই সম্মতি দিক, আইনি পরিণাম কিন্তু সেই আবেগ বা সমাজিক সম্মতির উপর নির্ভর করে না। বর্তমানে অভিযুক্ত যুবক পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন এবং তদন্ত চলমান। অন্যদিকে, প্রশাসন মেয়েটির সুরক্ষা ও মানসিক সহায়তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি আমাদের সামনে আরও একবার তুলে ধরেছে প্রেম, বিবাহ, নাবালিকাবস্থা এবং আইন—এই চারটি স্তম্ভের দ্বন্দ্ব। একদিকে আবেগ ও সামাজিক প্রথা, অন্যদিকে আইন ও নৈতিকতা। বিচার এখন আদালতের হাতে, কিন্তু বিতর্ক রয়ে গেল সমাজের ঘরে ঘরে।








