ঐতিহ্যের আলো ম্লান, উদ্বোধনে বিলম্ব, অতিথিদের প্রত্যাবর্তন—পরিচালনায় একক সিদ্ধান্তের অভিযোগে সরব স্থানীয়রা।
খোয়াই, ত্রিপুরা । কালীদাস ভৌমিকঃ রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসব সিঙ্গিছড়ার ৭৭তম শিব চতুর্দশী মেলা এবার শুরু হল চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগের মধ্য দিয়ে। একসময় রাজ্যের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া এই মেলা ঘিরে প্রতিবছর যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যেত, এবছর তার অনেকটাই যেন অনুপস্থিত। বরং সূচনালগ্ন থেকেই বিশৃঙ্খলা, সমন্বয়ের অভাব এবং দায়িত্বহীনতার অভিযোগে সরগরম হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ।
পাঁচদিনব্যাপী এই ঐতিহ্যবাহী মেলাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে স্টল বসান। ধর্মীয় উপকরণ, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রদর্শনী—সব মিলিয়ে মেলাকে ঘিরে গড়ে ওঠে এক সাময়িক অর্থনৈতিক পরিবেশ। স্টল ভাড়া, আলোকসজ্জা, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও অন্যান্য পরিষেবা বাবদ মেলা কমিটির উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আয় হয় বলে জানা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকেও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। কিন্তু এতসব আয়োজন সত্ত্বেও এবছর ব্যবস্থাপনায় যে ঘাটতি প্রকট হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই বলেই মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ।
অভিযোগ উঠেছে, খোয়াই আরডি ব্লকের উদ্যোগে মেলা আয়োজিত হলেও স্থানীয় গ্রামবাসীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। মেলার আহ্বায়ক প্রণব বিশ্বাসের একক সিদ্ধান্তে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে দাবি সাধারণ মানুষের একাংশের। ফলে সমন্বয়ের অভাব, দায়িত্ব বণ্টনে অস্পষ্টতা এবং মাঠপর্যায়ে তদারকির ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্থানীয় নেতৃত্বের অনেককেই এবছর মেলা প্রাঙ্গণে দেখা যায়নি, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বহু দর্শনার্থী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরেও তৈরি হয় চরম বিভ্রান্তি। বিকেল চারটায় উদ্বোধনের সময় নির্ধারিত থাকলেও সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে আমন্ত্রিত অতিথি ও দর্শকদের মধ্যে। রাজ্যের এক মন্ত্রীর উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি অনুপস্থিত থাকেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে জিলা পরিষদের সভাধিপতি অপর্ণা সিংহ রায় দত্ত এবং সমাজসেবী বিনয় দেববর্মা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। খালি চেয়ার আর অপেক্ষমাণ দর্শকদের হতাশ মুখ—উদ্বোধনের আগেই মেলা প্রাঙ্গণের পরিবেশ যেন অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়।
স্বেচ্ছাসেবকদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। দর্শনার্থীদের পথনির্দেশ, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থার অভাব চোখে পড়েছে বহুজনের। আরডি ব্লক ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরের প্রদর্শনীও ছিল সীমিত পরিসরে। বহু স্টলে প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে বলে অভিযোগ।
এছাড়া ভাষা ব্যবহারের বিষয়টিও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের স্টলে বাংলা ভাষার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সীমিত; নির্দিষ্ট দুটি ভাষাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় দর্শনার্থীদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, একটি ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক মেলায় স্থানীয় ভাষার যথাযথ মর্যাদা থাকা উচিত।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত এমন একটি ঐতিহ্যবাহী মেলার সার্বিক দায়ভার কে নেবে? কেন সময়মতো উদ্বোধন হল না? কেন আমন্ত্রিত অতিথিদের যথাযথ সম্মান জানানো গেল না? এবং সর্বোপরি, কেন স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হল না?
সিঙ্গিছড়ার শিব চতুর্দশী মেলা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। সেই ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, সমন্বিত পরিকল্পনা ও সক্রিয় তদারকি। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এবং আগামী দিনে মেলার জৌলুস ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।







