আত্মা প্রকল্পের উদ্যোগে নতুন কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগে আশাবাদী কৃষি দপ্তর — দক্ষিণ সোনাইছড়ির লিপি রানী সরকার পালের হাতে আদা চাষে সাফল্যের গল্প।
বিলোনিয়া, ত্রিপুরা । ০৭ নভেম্বর ২০২৫ঃ ত্রিপুরার দক্ষিণাঞ্চলে কৃষিক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। বিলোনিয়া মহকুমাধীন ঋষ্যমুখ ব্লকের উদ্যোগে ‘আত্মা প্রকল্প’-এর আওতায় এখন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে গ্রোব্যাগ পদ্ধতিতে চাষাবাদ।
যাদের কৃষিজমি সীমিত, তাদের কথা মাথায় রেখে কৃষি দপ্তর পরীক্ষামূলকভাবে এই নতুন পদ্ধতির প্রচলন করেছে।
এরই অংশ হিসেবে দক্ষিণ সোনাইছড়ি পঞ্চায়েতের লিপি রানী সরকার পাল নিজের বাড়ির উঠোনেই চালু করেছেন গ্রোব্যাগে আদা চাষ। অল্প জায়গা, সীমিত খরচ — অথচ ফলন আশাতীত!
লিপি রানী দেবীর কথায়, “প্রথমে মনে হয়েছিল এটা হয়তো সম্ভব হবে না, কিন্তু কৃষি দপ্তরের পরামর্শে চেষ্টা করলাম। এখন ফলন দেখে অবাক হচ্ছি।”
তিনি জানান, প্রতিটি ব্যাগে ৫০ শতাংশ মাটি, ২৫ শতাংশ জৈব সার, এবং ২৫ শতাংশ বালি মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে আদার জন্য উপযুক্ত মাধ্যম। তারপর প্রতিটি ব্যাগে এক টুকরো করে আদা রোপণ করা হয়েছিল।
শুক্রবার বিকেলে ঋষ্যমুখ কৃষি মহকুমার এগ্রি সুপারিন্টেন্ডেন্ট সুজিত কুমার দাস, রতনপুর সেক্টর অফিসার অভিজিত দত্ত, সাড়াসীমা সেক্টর অফিসার প্রণব মালাকার, এবং পঞ্চায়েত প্রধান রঞ্জিত মজুমদার নিজে উপস্থিত হয়ে এই গ্রোব্যাগ চাষের ক্ষেত পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন কালে কৃষি আধিকারিকরা একটি ব্যাগ থেকে আদা গাছ তুলে সরেজমিনে ফলন পরীক্ষা করেন। দেখা যায় — মাত্র ৫০ গ্রাম আদা লাগিয়ে ফলন হয়েছে প্রায় ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত!
অর্থাৎ, এক টুকরো আদা থেকে প্রায় দশগুণ ফলন।
কৃষি আধিকারিকদের মতে, এটি অত্যন্ত ইতিবাচক সাফল্য এবং ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য এক দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই পদ্ধতি শুধু আদা নয়, অন্যান্য মশলা ও সবজি চাষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকর হতে পারে। এতে খুব অল্প জায়গায় এবং কম পরিশ্রমে কৃষকরা ঘরের আঙিনায়, বারান্দায় বা ছাদে চাষ করে আয় করতে পারবেন।
এগ্রি সুপারিন্টেন্ডেন্ট সুজিত কুমার দাস বলেন —
“এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগে আমরা অত্যন্ত উৎসাহিত। অল্প জায়গায় কীভাবে উচ্চফলন সম্ভব, এই প্রকল্প তার প্রমাণ দিয়েছে। আগামী দিনে আরও অনেক কৃষককে এই পদ্ধতিতে উদ্বুদ্ধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।”
পঞ্চায়েত প্রধান রঞ্জিত মজুমদারও প্রশংসা করে জানান —
“এই সফলতা প্রমাণ করে, সঠিক পরামর্শ ও উদ্যোগ পেলে গ্রামের মহিলারাও এখন স্বনির্ভর কৃষক হতে পারেন।”
কৃষি দপ্তরের আধিকারিকরা আশাবাদী, আগামী এক মাসের মধ্যে আদাগুলি সম্পূর্ণ পরিপক্ব হলে ফলনের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এমন সাফল্য আসায় আত্মা প্রকল্পের আধিকারিকরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য—
“এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই হলো— ছোটো কৃষকদের কৃষি উৎপাদনে যুক্ত করা এবং জৈব পদ্ধতিতে চাষের প্রসার ঘটানো।”
স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ রাজ্যের ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য এক নতুন দিশা তৈরি করবে। এতে যেমন স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে, তেমনি গ্রামীণ নারীরাও ধীরে ধীরে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসবেন।
শেষে লিপি রানী সরকারের এক কথায় উঠে আসে তাঁর সাফল্যের মর্ম—
“আমার জমি নেই, কিন্তু ইচ্ছে আছে। গ্রোব্যাগে আদা চাষ আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। আগামী দিনে আমি আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই।”








