আসাম রাইফেলস ও কাস্টমসের গোপন অভিযানে ধরা পড়ল তিন কেজি ওজনের বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট; মুঙ্গিয়াকামি থানা সহ একাধিক থানার নজরদারির ঘাটতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
তেলিয়ামুড়া, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫: ত্রিপুরার তেলিয়ামুড়া মহকুমার অন্তর্গত মুঙ্গিয়াকামি থানার অধীনস্থ চাকমাঘাট এলাকায় আজ ভোররাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো এক যৌথ অভিযানে তিন কোটি টাকার বেশি মূল্যের ইয়াবা ট্যাবলেট সহ এক যুবককে গ্রেফতার করেছে আসাম রাইফেলস এবং কাস্টমস দপ্তরের কর্মকর্তারা। আটক হওয়া যুবক বক্সনগর এলাকার বাসিন্দা বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এই ঘটনায় গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
বিশেষ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আসাম রাইফেলস ও কাস্টমসের একাধিক ইউনিট যৌথভাবে একটি গোপন অভিযান পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আজ ভোরবেলা চাকমাঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে আগরতলা গামী একটি সাদা রঙের বোলেরো গাড়ি আটকানো হয়, গাড়ির তল্লাশি চালিয়ে ৩ কেজি ওজনের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য আনুমানিক তিন কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্যগুলি বিশেষ পদ্ধতিতে প্যাকেটজাত অবস্থায় গাড়ির ভেতরের গোপন চেম্বারে রাখা ছিল। এই ঘটনা থেকে অনুমান করা হচ্ছে যে একটি সুসংগঠিত মাদক চোরাচালান চক্র দীর্ঘদিন ধরেই ত্রিপুরা হয়ে মাদক পাচার করে চলেছে।
তদন্তে নেমে যৌথ বাহিনী ইতিমধ্যেই ধৃত যুবককে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে, এবং সম্ভাব্য মাদকচক্রের পিছনে থাকা মূল মাথাদের সন্ধানে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
প্রশংসিত হচ্ছে যৌথ বাহিনীর তৎপরতা, প্রশ্নের মুখে স্থানীয় থানাগুলোর ভূমিকা
এই অভিযানে আসাম রাইফেলস এবং কাস্টমস দপ্তরের দায়িত্বশীল ও সাহসী ভূমিকা ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশংসার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা অত্যন্ত দ্রুততা ও গোপনীয়তার সঙ্গে এই অভিযান পরিচালনা করে যেভাবে মাদকদ্রব্য সহ অপরাধীকে পাকড়াও করেছে, তা নিঃসন্দেহে এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
কিন্তু এই সাফল্যের মাঝেও তৈরি হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক – যে গাড়িটি এত বিপুল পরিমাণ মাদক নিয়ে চলছিল, সেটি বক্সনগর থেকে চাকমাঘাট পর্যন্ত একাধিক থানা এলাকা অতিক্রম করেছে, অথচ কোথাও গাড়িটিকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি, আটকানোও হয়নি। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় থানাগুলোর নজরদারি, চেকপোস্টের কার্যকারিতা এবং গোয়েন্দা তথ্যের আদানপ্রদান নিয়েও উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।
স্থানীয় সুশীল সমাজ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং সাংবাদিক মহলের একাংশের মত,
“যদি এই অভিযান গোপন সূত্রের ভিত্তিতে না হতো, তাহলে কি এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবা রাজ্যের ভেতর দিয়ে নির্বিঘ্নে পাচার হয়ে যেত? তাহলে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কতটা কার্যকর?”
মাদকচক্রের বিরুদ্ধে আরও কড়া পদক্ষেপের দাবি
ধৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে কোন আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাজ্য মাদকচক্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে, তা উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই যুবক আগেও মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ। এর পাশাপাশি উঠে আসছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য – চাকমাঘাট এলাকাটি বর্তমানে মাদক পাচারকারীদের একটি সক্রিয় করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে এলাকাবাসীর দাবি,
“মাদক বিরোধী অভিযানে স্থানীয় থানা ও প্রশাসনের আরও সক্রিয় এবং নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা প্রয়োজন। শুধু সীমান্তবর্তী এলাকায় নয়, রাজ্যের অভ্যন্তরেও নজরদারি জোরদার করতে হবে।”
এই ঘটনার মাধ্যমে একদিকে যেমন আসাম রাইফেলস ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের জন্য বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে সামনে এসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গাফিলতির চিত্র।
ত্রিপুরা রাজ্যের মাদক-বিরোধী লড়াইয়ে এই অভিযান এক নতুন উদাহরণ হলেও, একই সঙ্গে এটি রাজ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে বিদ্যমান ফাঁকফোকরগুলিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কতটা কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে মাদক পাচার রোধে কতটা কঠোর নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগ গৃহীত হয়।








