তেলিয়ামুড়া প্রতিনিধি: প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর সবুজের সমারোহে ঘেরা আঠারোমুড়া পাহাড়। কিন্তু এই শান্ত, স্নিগ্ধ প্রকৃতির আড়ালেই যে পদে পদে লুকিয়ে আছে বিপদ আর বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই, তা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সোমবারের এক ভয়াবহ ঘটনা। জঙ্গলের সবজি সংগ্রহ করতে গিয়ে এক বন্য ভাল্লুকের অতর্কিত আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছেন এক যুবক। তবে আক্রমণের থেকেও ভয়াবহ ছিল সভ্যতার আলো থেকে বিচ্ছিন্ন এক জনপদের অসহায়ত্ব। রাস্তার অভাবে প্রায় দশ ঘণ্টার এক অকল্পনীয় যন্ত্রণা ভোগ করে অবশেষে হাসপাতালে ঠাঁই হয়েছে ওই যুবকের।
ঘটনাটি ঘটেছে তেলিয়ামুড়া মহকুমার মুঙ্গিয়াকামী থানাধীন আঠারোমুড়া এ.ডি.সি ভিলেজের অন্তর্গত বিলাইকাং-এর কলই বস্তি নামক এক প্রত্যন্ত এলাকায়। জানা যায়, সোমবার সকাল আনুমানিক এগারোটা নাগাদ এলাকার যুবক অলীন্দ্র কলই তাঁর নিজের জুম চাষের জমিতে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল কলা গাছ থেকে কলার থুর সংগ্রহ করা। কিন্তু তিনি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে, জঙ্গলের গভীরে তাঁর জন্য ওত পেতে আছে এক সাক্ষাৎ মৃত্যু।
কলার থুর সংগ্রহ করার সময়ই ঘটে যায় সেই মর্মান্তিক ঘটনা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে এক বিশাল আকৃতির ভাল্লুক তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বন্য জন্তুটির হিংস্র আক্রমণে অলীন্দ্রর বাঁচার আর্তনাদ জঙ্গলের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিলেও, নিজেকে রক্ষা করার কোনও সুযোগই তিনি পাননি। ভাল্লুকের ধারালো নখের আঁচড়ে তাঁর মাথা, মুখ, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। সৌভাগ্যবশত, তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য সঙ্গীরা ঘটনাটি আঁচ করতে পেরে সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসেন। তাঁদের সম্মিলিত চিৎকারে এবং প্রতিরোধে ভাল্লুকটি অলীন্দ্রকে ছেড়ে জঙ্গলের গভীরে পালিয়ে যায়।
কিন্তু আসল লড়াইটা শুরু হয় এরপর। রক্তে ভেসে যাওয়া অলীন্দ্রকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন ছিল দ্রুত চিকিৎসার। কিন্তু কলই বস্তি এমনই এক দুর্গম এলাকা, যেখানে উন্নয়নের ছিটেফোঁটাও পৌঁছায়নি। নেই কোনও পাকা রাস্তা, নেই কোনও যান চলাচলের সুব্যবস্থা। সঙ্গীরা কোনওমতে ধরাধরি করে, কখনও কাঁধে, কখনও বা বাঁশের মাচায় করে অলীন্দ্রকে নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে শুরু করেন। দীর্ঘ চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার অমানুষিক পরিশ্রমে তাঁরা জাতীয় সড়কের কাছে পৌঁছান।
সেখান থেকে একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে যখন তাঁকে তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে ন’টা। সকাল এগারোটায় ঘটা এক ঘটনার পর, প্রায় সাড়ে দশ ঘণ্টার এক দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাময় প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। বর্তমানে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন অলীন্দ্র কলই। চিকিৎসকেরা তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে অসহায় বাবা কান্নাভেজা গলায় জানান, “যদি গ্রামে আসার মতো একটা রাস্তা থাকত, তাহলে আমার ছেলেকে হয়তো এত কষ্ট পেতে হতো না। ঘটনার পরপরই আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারতাম। এই রাস্তার জন্যই আমাদের জীবন-মরণ নির্ভর করে।”
এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি বন্য জন্তুর আক্রমণ নয়, এ হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের প্রতি প্রশাসনিক বঞ্চনা এবং উদাসীনতার এক জীবন্ত দলিল। এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করে দিল যে, স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও তেলিয়ামুড়ার পাহাড়ি জনপদগুলিতে একটি সাধারণ রাস্তা না থাকাটা কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অলীন্দ্র কলইয়ের আরোগ্য কামনা করার পাশাপাশি, এলাকাবাসীর এখন একটাই দাবি, কবে ঘুম ভাঙবে প্রশাসনের এবং কবে এই দুর্গম জনপদগুলিতে উন্নয়নের আলো পৌঁছাবে?








