আগরতলায় সিঁদুরে রঙিন অম্বুবাচী: নারীদের অক্ষয় মঙ্গলকামনায় বিশেষ রীতি লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়িতে।
আগরতলা, ২৩ জুন: আধ্যাত্মিকতা, আচার-অনুষ্ঠান ও নারীত্বের মহিমায় ভরা পবিত্র অম্বুবাচী তিথি শুরু হয়েছে রবিবার, ২২ জুন দুপুর ২টা ৫৭ মিনিটে। চলবে ২৫ জুন রাত ৩টা ২১ মিনিট পর্যন্ত। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই সময়টি এক পবিত্র, তবে কিছুটা গোপনীয়তায় আবৃত উৎসব—যা মূলত ধরিত্রী মাতার ঋতুমতী হওয়ার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
অম্বুবাচী—আচার ও আবেগের উৎসব:
‘অম্বুবাচী’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে “জল প্রবাহিত হওয়া” বা “ভেজা অবস্থা”। এটি শুধু একটি তিথি নয়, বরং একটি ধর্মীয় ভাবাবেগ ও প্রকৃতির অন্তর্জাগতিক ছন্দের প্রকাশ। হিন্দু শাস্ত্রে ও বেদে পৃথিবীকে ‘ধরিত্রী মাতা’ বা ‘মা ধরণী’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, আষাঢ় মাসে মৃগশিরা নক্ষত্রের চতুর্থ পদে ধরিত্রী ঋতুমতী হন—যেমনভাবে একজন নারী ঋতুবর্তী হন সন্তান ধারণের আগে। এই তিন দিন ধরিত্রী বিশ্রাম নেন। তাই এই সময়ে কোনও রকম মাঙ্গলিক কাজ, গৃহপ্রবেশ, বিবাহ, কিংবা নতুন জমিতে চাষ শুরু করার মতো শুভ কাজ বন্ধ রাখা হয়।

আচার-বিধি ও নিষেধাজ্ঞা:
অম্বুবাচী চলাকালীন বিশেষত সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী এবং বিধবারা কঠোরভাবে কিছু নিয়ম পালন করেন। মন্দিরের দরজা অনেক জায়গায় বন্ধ রাখা হয়, দেবদেবীদের স্নান বা পূজা বন্ধ থাকে। কৃষিকাজও স্থগিত রাখা হয় এই তিনদিন, কারণ বিশ্বাস করা হয়, ধরিত্রী তখন ‘বিশ্রামে’ রয়েছেন। অম্বুবাচী শেষ হবার পরই আবার শুরু হয় পূজা-পার্বণ, বিয়ে ও চাষাবাদের মতো শুভ কার্যকলাপ।
নারীর সৌভাগ্যের প্রতীক সিঁদুর—আগরতলার এক অনন্য চিত্র:
ত্রিপুরার আগরতলায় লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়িতে অম্বুবাচী উপলক্ষে এক বিশেষ দৃশ্য দেখা যায়। এই দিনে নারীরা পরস্পরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন। এটি কেবলমাত্র একে অপরের সৌভাগ্যের কামনাই নয়, বরং স্বামীর দীর্ঘ জীবন এবং সংসারে স্থায়িত্বের প্রার্থনার প্রতীক। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সিঁদুর যেন অক্ষয় হয়—এই প্রার্থনাতেই একে অপরকে পরিয়ে দেন মহিলারা।
অম্বুবাচীর সমাপ্তি ও পুনরায় জীবনচক্রের শুরু:
২৫ জুন রাত ৩টা ২১ মিনিটে শেষ হবে এই পবিত্র তিথি। এর পর আবার প্রাণ ফিরে পাবে ধরিত্রী। দেবী মূর্তিগুলির পুনরায় স্নান করানো হবে, মন্দিরের দ্বার উন্মুক্ত হবে, শুরু হবে নতুন চাষ, মাঙ্গলিক আচার ও বিবাহ অনুষ্ঠান। এই উৎসব প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক গভীর যোগের দিকও তুলে ধরে—প্রতিটি ধাপে নারীর জীবনীশক্তি, প্রজনন ও সৃষ্টির চেতনার এক অপার সম্মান জানানো হয়।
উপসংহার:
অম্বুবাচী শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একদিকে নারীর শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং অন্যদিকে পৃথিবীর উর্বরতা ও শস্য উৎপাদনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। এই উৎসব নারীত্বকে সম্মান জানায় এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ঐক্যবদ্ধতার গভীর বার্তা বহন করে।








