সুন্দরবনের শিক্ষায় নতুন দিগন্ত: ‘বেলা সাহা স্মৃতি বিদ্যা মন্দির’-এর প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

বেলা সাহার ৮১তম জন্মবার্ষিকীতে মানবিক উদ্যোগ, রক্তদান শিবির ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত হলো সুন্দরবনের প্রত্যন্ত প্রান্ত।

নিউজ ডেস্কঃ সুন্দরবনের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘বেলা সাহা স্মৃতি বিদ্যা মন্দির’ তার গৌরবময় এক বছর পূর্ণ করল রবিবার, ১লা মার্চ ২০২৬। শিক্ষা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিদ্যালয়টি যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালন করল তাদের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশের অন্যতম স্বনামধন্য গয়না প্রতিষ্ঠান শ্যাম সুন্দর কোং জুয়েলার্স-এর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) উদ্যোগের অংশ হিসেবে। সুন্দরবনের মতো দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই মানবিক প্রয়াসের সূচনা।


মহীয়সী বেলা সাহার স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে এক আলোকিত উদ্যোগ

বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়েছে এক অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব, প্রয়াত বেলা সাহার স্মৃতিতে। জীবদ্দশায় তিনি শিক্ষার শক্তিতে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও সাফল্য আজও বহু মানুষের কাছে প্রেরণার উৎস। তাঁর ৮১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিদ্যালয়ের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় প্রতীকীভাবে পায়রা উড়িয়ে এবং বিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে। শুভ সূচনার এই মুহূর্তে উপস্থিত অতিথি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী ও এলাকাবাসীর মধ্যে ছিল উৎসবের আবহ।


মূল আকর্ষণ: স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরে মানবিক বার্তা

দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল একটি বৃহৎ স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির। সুন্দরবন অঞ্চলের বহু মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন এই মানবিক কর্মসূচিতে। রক্তদাতাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে শিক্ষা ও সমাজসেবার এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে ইতিমধ্যেই গভীর প্রভাব ফেলেছে।

এই রক্তদান শিবির শুধু একটি স্বাস্থ্যসচেতনতা কর্মসূচিই নয়, বরং “প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবধর্ম” — এই বার্তাকে আরও সুদৃঢ় করে।


সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উপহার বিতরণ ও আনন্দ-উৎসব

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের জন্য নতুন পোশাক ও উপহার-সামগ্রী বিতরণ করা হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় গান, কবিতা আবৃত্তি ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দিনটিকে করে তোলে প্রাণবন্ত ও আবেগঘন।

সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট ছোট শিশুদের মুখে হাসি এবং মঞ্চে তাদের আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনা ছিল দিনের অন্যতম উজ্জ্বল মুহূর্ত। শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার এই প্রয়াস বিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষাদর্শকেই তুলে ধরে।


বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান পেল বিশেষ মর্যাদা

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এম. এল. লোহিয়া, চেয়ারম্যান, জুপিটার ওয়াগন্স লিমিটেড এবং সভাপতি, ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব।

সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুনীল পোদ্দার, চেয়ারম্যান (পূর্বাঞ্চল), জেমস অ্যান্ড জুয়েলারি কাউন্সিল; ড. সুজিত রায়, প্রাক্তন ইন-চার্জ, গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্স, কলকাতা এবং ড. দীপঙ্কর মণ্ডল, সম্পাদক, সুন্দরবন বিনোদপুর শিবম সোসাইটি।

প্রধান অতিথি শ্রী এম. এল. লোহিয়া তাঁর বক্তব্যে বলেন,
“শ্যাম সুন্দর কোং জুয়েলার্সের এই মহৎ উদ্যোগের অংশ হতে পেরে আমি নিজেকে সত্যিই গর্বিত মনে করছি। তাঁরা যে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করছেন, তার পাশে ভবিষ্যতেও থাকার প্রত্যাশা রাখি।”

তিনি তাঁর জীবনের কর্মনিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং একনিষ্ঠ সাধনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন— নিয়মিত প্রচেষ্টা ও সততার মাধ্যমেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।


পারিবারিক আবেগ ও শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকার

বেলা সাহার পুত্র এবং শ্যাম সুন্দর কোং জুয়েলার্স-এর ডিরেক্টর রূপক সাহা আবেগঘন ভাষণে বলেন,
“আমার প্রয়াত মা বেলা সাহা শিক্ষার শক্তিতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। বিবাহের আঠারো বছর পর কলেজে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি সর্বদা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।”

তাঁর কন্যা সুচরিতা রায় বলেন,
“বেলা সাহা বহু মানুষের কাছে মাতৃস্বরূপ ছিলেন, বিশেষত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে। তাঁর স্মৃতিতে নামাঙ্কিত এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে আমরা আবেগগতভাবে গভীরভাবে যুক্ত। ‘বেলা সাহা স্মৃতি বিদ্যা মন্দির’ যেন তার নামের মর্যাদা রক্ষা করে, সে লক্ষ্যে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”


সুন্দরবনের শিক্ষাক্ষেত্রে এক বছরের সাফল্যগাঁথা

মাত্র এক বছরে ‘বেলা সাহা স্মৃতি বিদ্যা মন্দির’ সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। নিয়মিত পাঠদান, নৈতিক শিক্ষার চর্চা, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং সামাজিক উদ্যোগ—সব মিলিয়ে বিদ্যালয়টি হয়ে উঠেছে স্থানীয় সম্প্রদায়ের আশার আলো।

দিনের অনুষ্ঠান শেষ হয় এক আন্তরিক প্রীতিভোজের মাধ্যমে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অতিথি ও এলাকাবাসী একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন — যা এই প্রতিষ্ঠানের মূল দর্শনকেই প্রতিফলিত করে: শিক্ষা, মানবিকতা ও সম্মিলিত অগ্রগতি।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You Missed

Horoscope Today: আজকের রাশিফল।

Horoscope Today: আজকের রাশিফল।

ZEISS VISION CENTER আগরতলায় উদ্বোধন।

ZEISS VISION CENTER আগরতলায় উদ্বোধন।

আইনের শাসন কি কেবলই ভাষণে? রাজ্যে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

আইনের শাসন কি কেবলই ভাষণে? রাজ্যে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

দেশজুড়ে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, ৮ রাজ্যে IMD-এর অ্যালার্ট।

দেশজুড়ে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, ৮ রাজ্যে IMD-এর অ্যালার্ট।

Narendra Modi: বাংলা থেকে ভয় পালাবে, হিসাব হবে প্রতিটা পাপের!” তৃণমূলকে কড়া হুঁশিয়ারি মোদির।

Narendra Modi: বাংলা থেকে ভয় পালাবে, হিসাব হবে প্রতিটা পাপের!” তৃণমূলকে কড়া হুঁশিয়ারি মোদির।

AAP: বড়সড় রদবদল! রাজ্যসভার ডেপুটি লিডার পদ থেকে অপসারিত রাঘব চাড্ডা।

AAP: বড়সড় রদবদল! রাজ্যসভার ডেপুটি লিডার পদ থেকে অপসারিত রাঘব চাড্ডা।