তেলিয়ামুড়া : সামাজিক অপবাদ এবং মানসিক চাপের এক মর্মান্তিক প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল তেলিয়ামুড়ার কালিটিলা এলাকায়। বুধবার সন্ধ্যায় রাকেশ মালাকার নামে এক যুবক নিজের ঘরেই ধারালো ব্লেড দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।[1] এই ঘটনায় সমগ্র এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেশীদের ক্রমাগত ‘নেশাখোর’ অপবাদ সহ্য করতে না পেরেই রাকেশ এই চরম পথ বেছে নেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
জানা যায়, বুধবার সন্ধ্যায় তেলিয়ামুড়া থানা এলাকার কালিটিলা গ্রামের বাসিন্দা রাকেশ মালাকার নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে দেন।[1] পরবর্তীতে পরিবারের লোকজন এবং প্রতিবেশীরা ঘরের ভেতর থেকে গোঙানির শব্দ শুনতে পান। দরজা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে তারা দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রয়েছেন রাকেশ। তার গলা, পেট এবং দুই হাতে গভীর ক্ষতের চিহ্ন ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে পড়েন সকলে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বেশ কিছুদিন ধরেই কিছু স্থানীয় বাসিন্দা রাকেশকে ‘ড্রাগস সেবনকারী’ বলে উপহাস ও কটূক্তি করত। এই অপমানজনক পরিস্থিতি তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর شدید প্রভাব ফেলে। বুধবার সন্ধ্যায় এই অপবাদ চরমে উঠলে, মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে রাকেশ আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। তিনি একটি ধারালো ব্লেড দিয়ে নিজের গলা, পাকস্থলী এবং দুই হাতের শিরা কেটে ফেলেন।[1]
ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে এবং পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এলাকার লোকজন உடனடியாக তেলিয়ামুড়া দমকল বাহিনীকে খবর দেন। খবর পেয়ে দমকল বাহিনীর কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাঁরাই রক্তাক্ত অবস্থায় রাকেশকে উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা কালবিলম্ব না করে তার চিকিৎসা শুরু করেন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে এবং বর্তমানে তার অবস্থা স্থিতিশীল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং রাজ্যের এক গভীর সামাজিক ব্যাধির প্রতিচ্ছবি। একদিকে যখন সরকার ‘নেশা মুক্ত ত্রিপুরা’ গড়ার ডাক দিচ্ছে, তখন অন্যদিকে নেশার ছোবলে যুবসমাজ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।[2][3] রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবের ‘নেশা মুক্ত ত্রিপুরা’ গড়ার যে স্বপ্ন ছিল, তা বাস্তবায়িত করতে বর্তমান প্রশাসনও নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।[2][4] প্রায়শই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়ে প্রচুর পরিমাণে নেশা সামগ্রী উদ্ধার করছে পুলিশ।[5] কিন্তু তারপরেও যেভাবে নতুন প্রজন্ম নেশার জালে জড়িয়ে পড়ছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক।[6]
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র প্রশাসনিক তৎপরতাই যথেষ্ট নয়। নেশার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।[6] আজকের এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, নেশার পাশাপাশি এই সংক্রান্ত সামাজিক অপবাদও কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে সাহায্য করার পরিবর্তে তাকে একঘরে করে দেওয়ার প্রবণতা এক নতুন সংকট তৈরি করছে, যার ফলস্বরূপ রাকেশের মতো যুবকরা আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই সামাজিক ব্যাধি রুখতে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে, নতুবা ‘নেশা মুক্ত ত্রিপুরা’র স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সচেতন নাগরিকরা।








