দীর্ঘ সাত মাস ধরে পানীয় জলের সঙ্কটে কৈলাসহরের ১৫ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড, ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে পথ অবরোধ।
কৈলাসহর, ত্রিপুরা । ২২ জুলাই ২০২৫ঃ ত্রিপুরার উত্তর জেলার সদর শহর কৈলাসহরের অন্তর্গত সুনামারা এলাকায় আজ সকাল থেকে অশান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কারণ, পানীয় জলের মতো মৌলিক অধিকার থেকে টানা সাত মাস ধরে বঞ্চিত হয়ে পড়েছেন কৈলাসহর পুরপরিষদের অধীনস্থ ১৫ নম্বর ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের বহু পরিবার। প্রতিদিনের জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদা—পানীয় জল—না পেয়ে ক্রমাগত সমস্যার সম্মুখীন হয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকাবাসী।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, পুরপরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের একাধিকবার অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আশ্বাস মিলেছে বারবার, কিন্তু বাস্তবে সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়েছে।
এই দীর্ঘ অবহেলা এবং চরম ভোগান্তির বিরুদ্ধে আজ এলাকাবাসী নিজেরাই পথে নেমে প্রতিবাদ জানান। সকাল থেকেই সুনামারা এলাকায় রাস্তার উপর টায়ার জ্বালিয়ে পথ অবরোধ শুরু করেন স্থানীয় মানুষজন। হাতে প্ল্যাকার্ড, গলায় স্লোগান—“জল চাই, বাঁচতে চাই” ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। অবরোধে সামিল ছিলেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং গৃহবধূরা পর্যন্ত।
অবরোধের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী, অফিসমুখী কর্মজীবী, পথচারী এবং যানবাহনের চালকরা আটকে পড়েন। কোনো জরুরি পরিষেবার গাড়িও আটকে পড়ে বলে জানা যায়। রাস্তায় যান চলাচল সম্পূর্ণ থমকে যাওয়ায় শুরু হয় চরম বিশৃঙ্খলা।
অবস্থা ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকায় তৎপর হয় কৈলাসহর থানার পুলিশ। বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে এসে প্রথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। পুলিশ আধিকারিকরা অবরোধকারীদের শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন, তবে ক্ষুব্ধ জনতা জানিয়ে দেন—কথা নয়, চাই নির্ভরযোগ্য পদক্ষেপ।
পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে হাজির হন মহকুমা শাসক (SDM) অফিসের DCM (Deputy Collector Magistrate)। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনায় বসেন এবং জল সরবরাহ সমস্যা সমাধানের বিষয়ে প্রশাসনিক স্তরে পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, আগামী দিনগুলিতে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় ট্যাঙ্কার পরিষেবাও আপাতত চালু করা হতে পারে।
DCM-এর এই আশ্বাসের পরে অবরোধকারীরা ধীরে ধীরে রাস্তাটি মুক্ত করেন। পুলিশের সহায়তায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এক অবরোধকারী প্রবীণ ব্যক্তি বলেন,
“বাঁচার জন্য জল চাই—এটা তো বিলাসিতা নয়, মৌলিক অধিকার। সাত মাস ধরে জল নেই, অথচ কাউন্সিলরের গাড়ি চললেও সমস্যার দিকে চোখ পড়ে না। আমরা আর কতো দিন সহ্য করবো?”
এক গৃহবধূ জানান,
“বাচ্চাদের রান্না করা তো দূরের কথা, হাত ধোয়ার জল থাকে না। সরকার কাগজে কলমে বলছে সব জায়গায় পানি পৌঁছে গেছে—কিন্তু আমাদের ঘরে তো কিছুই পৌঁছায়নি।”
এই ঘটনা শুধুমাত্র এক এলাকার পানীয় জল সমস্যার প্রতিফলন নয়—এটি প্রশাসনিক অবহেলা, দায়বদ্ধতার অভাব এবং জনগণের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কষ্টের বহিঃপ্রকাশ। যে কোনও শহরে, পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি মৌলিক দায়িত্ব। কৈলাসহরের সুনামারা এলাকাবাসীর আজকের প্রতিবাদ সেই দায়িত্ববোধকে স্মরণ করিয়ে দিল।








